বিজন কুমার বিশ্বাস:
কক্সবাজার জেলার সবকটি উপজেলার বিস্তীর্ন জমিতে এবছর শীতকালীন সবজি চাষে বাম্পার ফলন হয়েছে, বিধায় কৃষকের মুখেও হাসির জোয়ার। চাষাবাদের পরিবেশ অনুকুলে থাকায় এবং ক্ষেতে রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব কম থাকার কারণে অতীত বছরের তুলনায় এবার শীতকালিন সবজি চাষে আশাতীত সাফল্য পেয়েছে সবজী চাষারীরা। শীতের শুরুতে আগাম ফলন হওয়ায় ভালো দাম পেয়েছে কৃষকরা। শুধুমাত্র গেল নভেম্বর-ডিসেম্বর দুইমাসে উপজেলার অন্তত সাত হাজার সবজি চাষি ক্ষেতের ফসল বিক্রি করে কমপক্ষে ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকা আয় করেছে।
সরেজমিনে জেলার উপজেলা গুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, এখনো মাঠজুড়ে সবজি ক্ষেতের সবুজ সমারোহ বিদ্যমান রয়েছে। ক্ষেতে সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে বেগুন, টমেটো, বরবটি, ঢেড়স, চালকুমড়া, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, ঝিঙ্গা, মরিচ, মুলা, ফুলকপি, বাধাকপি ছাড়াও শীতকালীন বিভিন্ন ধরণের শাক-সবজি। বিশেষ করে চকরিয়া উপজেলার বুকচিরে প্রবাহিত মাতামুহুরী নদীর দুইতীরে এবছর সবজি চাষে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে চাষীরা।
সবজি চাষে যুক্ত কৃষকেরা বলেছেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় মিশ্র চাষের প্রচলন দীর্ঘদিন হয়ে আসছে। পাহাড়ে যেমন জুম চাষে হরেক রকমের ফসল হয়। তেমনি মিশ্র চাষেও আবাদ হয় নানান রকম সবজির। চলতি মৌসুমের শেষ দিকের হালকা নিন্মচাপ এখানকার মিশ্র ক্ষেতের ফসলে অভাবনীয় উর্বরতার যোগান দিয়েছে। মৌসুমের শুরুতে পাহাড়ি ঢলে কোন কোন এলাকায় কিছু ফসলহানি হলেও বর্তমানে তা কাটিয়ে উঠেছে চাষীরা। তবে পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা নতুন মাটিতে নতুন করে আবাদ করার পর অধিক ফলন পেয়ে হতবাক প্রান্তিক চাষীরা।কৃষকেরা দেখছেন, সবজি ক্ষেতে কোনরকম সার ছাড়াই বেড়ে যাচ্ছে গাছ। নির্ধারিত সময়ে ধরতে শুরু করেছে ফলন। কক্সবাজার জেলা কৃষি কর্মকর্তা কবির হোসাইন বলেন, শাকসবজির ভান্ডার হিসেবে পরিচিত চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার সদর, টেকনাফ, উখিয়া, পেকুয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ জমিতে এবছর শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে
চকরিয়ার উপজেলার প্রান্তিক সবজি চাষী আবদুর রহিম প্রতিনিধিকে জানান, এবছর আমি মরিচ, ফুলকপি, বাধাকপি, টমেটো, লাউ, ধনিয়া, লালশাক চাষ করিছে ৫বিঘার মত এখন পর্যন্ত খরচখরচা বাদ দিয়ে ৩/৪ লাখ টাকা আয় করেছি, আশা করছি আরো ৪লাখ টাকার উপর আয় করতে পারবো। এবছর আবহাওয়া ভালো থাকায়,রোগবালাই কম থাকায় উৎপাদনও বেশী হয়েছে বলে আয় আশার থেকেও বেশী করতে পারবো মনে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন এবার তিনি উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সার, বীজ ও কিছু কৃষি কাজের উপকরণ পেয়েছেন। আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন মাঝে মাঝে কৃষি অফিস থেকে লোকজন এসে আমাদের সাথে আলোচনা করেন। যদি কোন সমস্যা থাকে তাহলে সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
জেলা কৃষি অফিসের হিসেব মতে, ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে জেলায় ৭৭৫০ হেক্টর জমিতে ২,৩২,৫০০ মেঃট্রন সবজি চাষ করার তথ্য থাকলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, চাষের পরিধি আরো বাড়তে পারে।এর মধ্যে চকরিয়া উপজেলায় ৩৩১০ হেক্টর জমিতে ৯৯৩০০ মেঃট্রন, পেকুয়া উপজেলায় ৬৪৬ হেক্টর জমিতে ১৯৩৮০ মেঃট্রন, রামু উপজেলায় ৭৭৫ হেক্টর জমিতে ২৩২৫০ মেঃট্রন, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৮৩৮ হেক্টর জমিতে ২৫১৪০ মেঃট্রন, উখিয়া উপজেলায় ৬৯৫ হেক্টর জমিতে ২০৮৫০ মেঃট্রন, টেকনাফ উপজেলায় ৭৬৩ হেক্টর জমিতে ২২৮৯০মেঃট্রন, মহেশখালী উপজেলায় ৩৭৮ হেক্টর জমিতে ২২৮৯০ মেঃট্রন, কুতৃবদিয়া উপজেলায় ৩৪৫ হেক্টর জমিতে ১০৩০০ মেঃট্রন উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে।
তিনি আমাদরের প্রতিনিধিকে আরো বলেন, আবাদি জমি ছাড়াও এবছর মাতামুহুরী নদীর দুই তীরে জেগে উঠা চরে রকমারি সবজি চাষ করেছেন কৃষকেরা। দুইমাস আগে থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সবজি বাজারে উঠতে শুরু করেছে। শীতকালীন সবজি হিসেবে এ অঞ্চলে বেগুন, বরবটি, ঢেড়স, শসা, ক্ষীরা, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, ঝিঙ্গা, কচু, ঘিমা কলমি, কাকরোল, করলা, লাউ, চিচিঙ্গা, ডাটা, লালশাক, ধুন্দুল, পুঁইশাক ও পাটশাকের ব্যাপক আবাদ হয়েছে।এবছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবং ক্ষেতে রোগ-বালাই কম থাকার কারণে শীতকালীন সবজিরও বাম্পার ফলন হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক মোঃ কবির হসোন বলেন, শীতকালীন সমজি চাষের শুরুতে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে উপজেলায় উপজেলায় কৃষকদের সবজি চাষে উৎসাহিত করা হয়েছে। ওইসব এলাকায় কৃষকদের মাঝে সরকারিভাবে বিনামুল্যে সার, বীজ সহ কিছু কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। তাই সরকারি সহায়তা পেয়ে নতুন অনেক কৃষকেরা আশা জাগিয়ে শাক-সবজির আবাদ করেছেন এবছর।
Leave a Reply