তৌহিদুল ইসলাম কায়রু
লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
চট্রগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের অধীনে সুফল প্রকল্পের বনায়নে সুকৌশলে টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠেছে বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের অধীনে ৪০ হেক্টর বনের জায়গায় ১ লক্ষ মিশ্র প্রজাতির দ্রুত বর্ধনশীল চারা রোপনের সাইনবোর্ড লাগানো হলেও বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ১০/১২ হেক্টর বন জায়গায় মাত্র ২৫ হাজার চারা রোপন করে সুকৌশলে টাকা লোপাট করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চুনতি সাতগড় বনবিটের পূর্ব পাশের তেরপোলা, কইন্যারতলী, বড়তলীর দক্ষিণে তথা বাগপাচা ঝিরি পর্যন্ত যেসব বাগান করা হয়েছে তার হিসেব শুধু কাগজে-কলমে ও সাইনবোর্ডে সীমাবদ্ধ। সাইনবোর্ডে বাগানের চারার সংখ্যা ও গাছের প্রজাতির কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার কোন মিল পাওয়া যায়নি।
এছাড়াও বাগানের সাইনবোর্ডে গামার, চিকরাশি, আকাশমনি, পিতরাজ, ধারমারা, সোনালু, কাজুবাদাম, ছাতিয়ান, সিভিট, রক্তচন্দন, খয়ের, আমলকি, হরিতকী, বহেরা, অর্জুন,কাঞ্চলভাদী, নিম, বকাইন, শিমুল, পলাশ, কাঞ্চন, চাকুয়া কড়ই, তেতুয়া কড়ই, কড়ইসহ বিভিন্ন প্রজাতির ১ লাখ গাছের চারা লাগানোর কথা থাকলেও সরেজমিনে সাইনবোর্ডের প্রজাতির সাথে বাস্তবতার কোন অস্তিত্ব নেই। কয়েকটি প্রজাতির দেখা মিললেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লাগানো হয়েছে আকাশমনি ও অন্যগাছ।
নার্সারীতে কাজ করা একাধিক শ্রমিকসহ আব্দুর রহিম নামের একজন জানান, নার্সারীতে ব্যবহার করা হয়েছে সাতগড় বনবিট অফিসের পিছনের পাহাড়ের মাটি, খুটি হিসেবে পাহাড়ের বাঁশ কাটা হয়েছে।যেগুলো ঠিকাদার কর্তৃক সরবরাহ থাকার কথা থাকলেও সরবরাহ করেছে স্বয়ং তৎকালিন বিট অফিসার রফিকুল ইসলাম। এখানে কাগজে কলমে ঠিকাদার থাকলেও বাস্তবে এর কোন অস্তিত্ব ছিলনা।
দেখা যায়, কোন জায়গায় বাগানের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চারা নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া, যে চারা গুলো লাগানো হয়েছে অনেক গাছের চারা প্রথম বছরেই মারা গেছে । দ্বিতীয় বছরে সার দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি বলে শ্রমিকরা জানায়। অভিযোগ রয়েছে, সুফল প্রকল্পের বনায়ন অংশীদার নিয়োগেও জনপ্রতি ৩০/৪০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছে তৎকালীন বিট কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। এছাড়াও, অংশীদারদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে বাগান সৃজনের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিট কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করেও রিসিভ করেন নি।
বনায়নে জৈব সার, রাসায়নিক সার ও প্রতিটি গাছের সাথে খুটি লাগানোর নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। বনায়নের চিকরাশি, গামার, আকাশমনি, চাতিয়া, করই, বহেরা, অর্জুন গাছ লাগানোর নির্দেশনা থাকলেও তা যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি।
অপরদিকে ৬ ফুট অন্তর চারা রোপনের কথা থাকলেও একেকটি চারার দূরত্ব করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ ফুট। চারা রোপণের পূর্বে গোবর সার ও রাসায়নিক সার দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি। আর এ কারণেই গত অর্থবছর করা বাগানের প্রায় ৭০ শতাংশ চারা ইতিমধ্যে মারা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাগান অংশীদার ব্যক্তি বলেন, ৪০ হেক্টর বাগান করার কথা থাকলেও প্রায় ৩০ হেক্টরে কোন বাগান না করেই বরাদ্দকৃত টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রফিকুল ইসলাম ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দিনমজুর দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রেও জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রোহিঙ্গা শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে তাদেরকে দৈনিক ২৫০/৩০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে মাস্টাররোলে ৫/৬শ টাকা হারে তুলে এই বিপুল পরিমান টাকা আত্মসাত করা হয়েছে।
জানা গেছে, শ্রমিকদের দিয়ে মাটি কাটা, ব্যাগে মাটি ভরা ও ব্যাগে বীজ দেয়ার কাজ করানো হয়। প্রচলিত নিয়ম মোতাবেক বাগান করার সময় শ্রমিক ডাটাবেজ করা হয়। সে মোতাবেক সারাবছর এ সকল দিনমজুর/শ্রমিকরা কাজ করবে। পাশাপাশি এ সকল শ্রমিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কার্ড সংরক্ষণসহ মাস্টার রোলে সই/স্বাক্ষর রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা শ্রমিকদের কোন এনআইডি না থাকলেও সংশ্লিষ্ট বনবিট কর্মকর্তা রফিকুল ভুয়া এনআইডি নাম্বার ও নাম ঠিকানা বসিয়ে প্রিন্ট করে সরকারি ফাইলে সরবরাহ করেছেন।
বাগানের সম্মুখভাগে কিছুটা নিয়ম মাফিক হলেও ভেতরে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। কারণ হিসেবে জানা যায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাগান পরিদর্শনে গেলে সম্মুখভাগের বাগান দেখেই চলে আসেন। বিভিন্ন পোকামাকড় ও কাদা পানি থাকায় পরিদর্শন টিম ভিতরে ঢুকতে চান না। আর এই সুযোগটাই বাগান তৈরীর কাজে নিয়োজিতরা নিয়েছেন। অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে চুনতি রেন্জ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান কোন তথ্য দিতে বা কথা বলতে রাজি হননি। তিনি শুধুই বলেছেন, আমি এখানে সম্প্রতি যোগদান করেছি। বাগানের অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত চলছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক দেলোয়ার হোসেনের যোগসাজশে বনায়নে লোপাট হয়েছে। তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বনবিট কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বেপরোয়া ছিলেন। বিট কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম টাকার বিনিময়ে স্থানীয়দের দখলে দিয়েছে বনের জায়গা।
স্থানীয় সাঈদ মাহবুবুর রহমান বলছেন, সুফল প্রকল্পের যে টাকা বিশ্ব ব্যাংক দিয়েছে তা ঋণ হিসেবে দিয়েছে। যদি এভাবে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়, উক্ত ঋণের দায়ভার বন বিভাগ কি বহন করতে পারবে? তাহলেই বলতেই হয় এ যেন ঋনের টাকায় ঘি খাওয়া।
এ বিষয়ে সহকারি বন সংরক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বনায়নে কোন অনিয়ম হয়নি। বনায়নের সময় পরিদর্শন করা হয়েছে।৪০ হেক্টর বনায়নে ৪৬ হেক্টর বনায়ন করা হয়েছে। তবে বনায়ন করতে গেলে ২০ শতাংশ চারা নষ্ট হয়। তা পরের বছর পূরণ করে দেওয়া হবে।
জানতে চাইলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিষয়টি তদন্তানাধীন।
Leave a Reply