লেখক: ছালেম বিন নূর
ভূমিকা:
আমি ছালেম বিন নূর। কক্সবাজার জেলার প্রতিনিধি হিসেবে আমার কলম সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল। দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক অনিয়ম—এসব প্রকাশ করাই আমার দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একদিন আমি নিজেই হলাম রাক্ষুস প্রশাসন ও সিন্ডিকেট সাংবাদিকদের ষড়যন্ত্রের শিকার।
এ বইতে আমি তুলে ধরব সেই ভয়াবহ রাতের কাহিনী, যখন শুধু আমাকে নয়—আমার পরিবার, আমার মা, আমার স্ত্রী, এমনকি আমার পাঁচ মাসের সন্তানকেও মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত করা হলো।
অধ্যায় ১: ফেসবুক স্ট্যাটাসের আগুন
ডিসেম্বর ২০২১।
কয়েক মাস ধরে আমি চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিস সহকারী শান্তি পদ-দে’র দুর্নীতির খবর সংগ্রহ করছিলাম। ঘুষ, দলিলপত্রে জালিয়াতি, এমনকি ইস্কন সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার প্রমাণ আমার হাতে এসেছিল।
২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আমি একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিই। সেখানে নাম উল্লেখ না করে দুর্নীতির কাহিনী প্রকাশ করি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইউএনওর দেহরক্ষী মাহমুদুল হাসান আমাকে ফোন করে—
“স্যার আপনাকে ডাকছেন। এখনই অফিসে আসেন।”
আমার মনে শঙ্কা জাগল। তবুও গেলাম, তবে সাবধানতার জন্য ফোনটা বাসায় রেখে এলাম।
অধ্যায় ২: ইউএনওর অফিসে সিন্ডিকেট
সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইউএনও সৈয়দ শামসুল তাবরীজের অফিসে পৌঁছালাম। ভেতরে ঢুকেই দেখি, শুধু ইউএনও নন—আছে দেহরক্ষী মাহমুদুল, শান্তি পদ-দে, সৌরভ, কাজল, ইসফাত আর আরও কয়েকজন রাক্ষুসে সাংবাদিক।
তারা সবাই মিলে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
একজন বলল—“তোকে আজ শিক্ষা দিবো।”
অন্যজন ধমক দিল—“সাংবাদিকতার নামে গুজব ছড়াচ্ছিস, এখন দেখবি।”
এই সময় ডাক পড়ল স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার ওসমান ও তার পরিবারকেও। উদ্দেশ্য ছিল, বিষয়টা যেন পারিবারিক শত্রুতার রূপ নেয় এবং প্রকৃত ঘটনা চাপা পড়ে যায়।
অধ্যায় ৩: ভয় আর অঙ্গীকারনামা
আমাকে ঘিরে সবাই চিৎকার করছে।
শান্তি পদ-দে সামনে এসে বলল—
“আমি ইস্কনের সদস্য। তোকে এখনই মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দিব।”
তারা আমার হাতে থাকা কাগজপত্র কেড়ে নিল, ফোন থেকে ফেসবুক স্ট্যাটাস মুছে ফেলল। এরপর আমাকে জোর করে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করানো হলো।
বিদ্যুৎ শক দেই—এই রকম মৃত্যু হবে।”
এই হুমকিতে আমি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই।
রাত সাড়ে দশটার দিকে তারা আমাকে ছেড়ে দেয়।
অধ্যায় ৪: মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন
পরদিন রাতে তারা আরও এক ধাপ এগোয়।
আমার ঘরে ঢুকে, মায়ের সামনে, স্ত্রীর সামনে, আর কোলে কাঁদতে থাকা পাঁচ মাসের সন্তানের সামনে আমাকে ফেলে দেওয়া হলো মেঝেতে।
বুট দিয়ে পেটানো হলো, লাঠির আঘাত পড়ল পিঠে। ইলেকট্রিক শকড দেওয়া হলো।
স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“দয়া করে ওকে মেরে ফেলবেন না…”
একজন ঠাট্টা করে বলল—
“তুই যদি চুপ না থাকিস, তোকে নগ্ন করে বাজারে ঘোরাব।”
শিশুর কান্না, মায়ের আর্তনাদ, স্ত্রীর চিৎকার—সব মিলিয়ে যেন মধ্যযুগের অন্ধকার।
অধ্যায় ৫: চিকিৎসা ও প্রমাণ
পরদিন সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। শরীরে আঘাতের দাগ স্পষ্ট।
ডাক্তার আমাকে দেখেই বললেন—“তোমাকে মারধর করা হয়েছে।”
চিকিৎসার রিপোর্ট আর ছবি আমি সংরক্ষণ করি।
অধ্যায় ৬: প্রভাবশালীদের হুমকি
শুধু শারীরিক নির্যাতনই নয়, মানসিক চাপও অব্যাহত ছিল।
স্থানীয় চেয়ারম্যান বারবার আমার পরিবারকে হুমকি দিতে থাকে—
“ছালেমকে আমাদের কাছে হাজির করো, না হলে তোমাদের জীবন বিপদে ফেলব।”
মা কাঁদতে কাঁদতে বলতেন—“বাবা, তুই কেন এই কাজগুলো করিস? এরা খুব শক্তিশালী।”
অধ্যায় ৭: সাংবাদিকতার নিরাপত্তা
এই অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝিয়েছে, সাংবাদিকতা আমাদের দেশে শুধু দায়িত্ব নয়, জীবনের ঝুঁকিও।
যখন প্রশাসনের দায়িত্ব মানুষের সুরক্ষা দেওয়া, তখন তারা নিজেই যদি নির্যাতন চালায়—তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
অধ্যায় ৮: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বনাম ইউএনও
আমি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ করি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তদন্তের ঘোষণা দেয়।
কিন্তু ইউএনও সৈয়দ শামসুল তাবরীজ সময় নষ্ট করেননি।
তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের খামে টাকা বিলিয়ে নিজের পক্ষের সংবাদ ছাপাতে শুরু করালেন।
যারা আমার পাশে দাঁড়াত, তাদেরকে তিনি “জামায়াত শিবির” ট্যাগ দিলেন।
অধ্যায় ৯: স্বৈরাচারী আমল ও ঘুষ সিন্ডিকেট
এ সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
স্বৈরাচারী শাসনের ছায়ায় ইউএনও–ভূমি কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন করছে, আর সেই অনিয়ম ঢাকতে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো হচ্ছে।
জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে তৈরি প্রশাসনিক আসন আসলে হয়ে উঠছে ব্যক্তিগত বাণিজ্যের আস্তানা।
আর সাংবাদিকের কলম যখন সত্য লিখে দেয়, তখন তাকে রক্তাক্ত করা হয়।
উপসংহার:
চকরিয়ার সেই রাত শুধু আমার নয়—এটা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়।
আমি চাই না আর কোনো সাংবাদিক তার মা, স্ত্রী, কিংবা সন্তানের সামনে এমন নির্যাতনের শিকার হোক।
কলম থামানো যাবে না।
সত্য একদিন সামনে আসবেই।
✍
Leave a Reply