বিজন কুমার বিশ্বাস:
নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় চকরিয়ার রামপুরে মোহাম্মদ হোসেনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। র্যাবপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব) বলছে, ঘটনাটি সাজানো। হত্যাকারীরা ডাকাতির নাটক সাজিয়ে বন্দুক দিয়ে গুলি করে মোহাম্মদ হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে। পরে ঘটনাটিকে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সংঘবদ্ধ চক্রটি। পরে হত্যাকারারীই সামাজিক যোগাযোগ ম্যাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মিথ্যা পপ্রচারণা চালায় এবং বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে।
র্যা ব আরো জানিয়েছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আধিপত্য, চাঁদাবাজি, প্রতিপক্ষেকে ঘায়েল ও চিংড়ি ঘের দখলের জন্য হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ জড়িত ১৪ জনকে গত বুধবার ১৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এদের গ্রেফতার করা করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার ১৮ জানুয়ারি দুপুরে কাওরানবাজারে র্যা ব মিডিয়া সেন্টারে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন র্যারবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন মূল পরিকল্পনাকারী শহিদুল ইসলাম লিটন (৪৫), আবু জাফর (৫০), মো. সোহেল (৩৭), আজগর আলী (৪৫), আবুল হোসেন পাখী (৩৫), নাজমুল হোসাইন রকি (২৭), আবদুর রহিম (৪৮)। সহযোগীরা হলেন- জয়নাল আবেদীন (৫৫), মো. শাহিন (২৩), মুহাম্মদ শাহাব উদ্দিন (৪৪), প্রদীপ কুমার শীল (৪৮), মো. রিদুয়ান (৩১), আবদুল হক (৫৫), মো. কাইছার (৩৫)।
সংবাদ সম্মেলনে খন্দকার আল মঈন সংবাদ কর্মীদের বলেন, গত ৯ জানুয়ারি রাতে চকরিয়া উপজেলার রামপুরা চিংড়ি ঘেরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীর গুলিতে মোহাম্মদ হোসেন নামে এক চিংড়ি ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতেরে ছেলে গত ১২ জানুয়ারি বাদী হয়ে চকরিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার সূত্র ধরে র্যা বের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাাব-৩ এর একটি দল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে র্যা বকে তথ্য দিয়েছে দাবি করে খন্দকার আল মঈন বলেন, চকরিয়ায় রামপুর সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি’র সভাপতি হিসেবে গ্রেফতার আবু জাফর ও সেক্রেটারি হিসেবে শহিদুল ইসলাম লিটন দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ভিকটিম মোহাম্মদ হোসেন সমিতির সদস্য হিসেবে দীর্ঘ ৭ বছর চিংড়ি ঘের এলাকার ৪৮ একর জমির মধ্যে খামার ঘর তৈরি করে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। পাশাপাশি চিংড়ি ঘের পাহারার দায়িত্বেও নিয়োজিত ছিলেন।
এই সমিতিতে প্রায় ৭০০ জন্য সদস্য রয়েছেন বলে জানা যায়। সমিতির মালিকানাধীন চিংড়ি ঘেরের সাহারবিলের রামপুর মৌজায় ৫১১২ একরের আরও একটি চিংড়ি ঘের রয়েছে। এর মধ্যে কিছু চিংড়ি ঘের সমিতির নিয়ন্ত্রণে ছিল না। নিয়ন্ত্রণে না থাকা চিংড়ি ঘের দখলে নিতে গত ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর থেকে গ্রেফতার লিটনের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী মহড়া দিতে থাকে। তারা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে কয়েকশত রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে।
র্যা ব আরো বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রেফতার আবু জাফর ও লিটন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে গ্রেফতার সোহেল, আজগর আলী, আবুল হোসেন পাখী, নাজমুল হোসাইন রকি ও আবদুর রহিমকে গুলিবর্ষণের দায়িত্ব দেয়। পরবর্তীতে গত ৯ জানুয়ারি সকাল ১১টায় লিটনের নির্দেশে মোবাইলে ফোন করে মোহাম্মদ হোসেনকে চিংড়ি ঘেরে ডেকে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে সেখান থেকে মোহাম্মদ হোসেন দুপুরের পর বাড়ি ফিরতে চাইলে লিটন ও তার সহযোগীরা রাতে মিটিং আছে জানিয়ে তাকে ফাঁকা জায়গায় নির্মিত ঘরে আটকে রাখে। পরে তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়।
৯ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ভিকটিম মোহাম্মদ হোসেনকে ওই চিংড়ি ঘেরের পাশে লবণ চাষের খালি জমিতে নিয়ে গিয়ে লিটন, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সোহেল গুলি করে হত্যা করে। পরে ডাকাতির নাটক সাজিয়ে বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।
খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতারকৃতরা হত্যাকাণ্ডটিকে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ম্যাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মিথ্যা প্রচার-প্রচারণা চালায় এবং হত্যাকারীদের বিচারের জন্য আন্দোলন করতে থাকে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের নাম প্রকাশিত হলে গ্রেফতারকৃতরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যায়।
র্যা ব আরও বলেন, রামপুর সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতির’ সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়। ওই চিংড়ি ঘেরে নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য এলাকায় ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী দল গঠন করে। এই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী দলের মাধ্যমে অবৈধভাবে জমি দখল, হুমকি, মারামারি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, অপহরণসহ বিভিন্ন ধরণের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। তার বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় দস্যুতা, মারামারি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, অপহরণসহ ৭টির বেশি মামলা রয়েছে।এছাড়া সোহেলের বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় হত্যা, অপহরণ, নারী নির্যাতন, মারামারিসহ ৭টির বেশি মামলা রয়েছে। আবুল হোসেনের নামে চকরিয়া থানায় হত্যা, মারামারিসহ ৪টি মামলা রয়েছে। গ্রেফতারকৃত রহিমের নামে চকরিয়া থানায় একটি মারামারির মামলা রয়েছে।
Leave a Reply