বিজন কুমার বিশ্বাস, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি:
পর্যটননগরী কক্সবাজারে দিনদিন গভীরতর হচ্ছে সুপেয় পানির সংকট। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—সবখানেই বেড়েছে পরিশোধিত ও বোতলজাত পানির চাহিদা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং আয়রন দূষণের কারণে এই সংকট এখন নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর (ডিপিএইচই) সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার পৌর এলাকায় প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত পানির স্তর নিচে নামছে। ঘনবসতিপূর্ণ কলাতলী, টেকপাড়া ও আশপাশের এলাকায় বর্তমানে ৯০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে গিয়ে স্বাদু পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও অনেক কম গভীরতায় মিলত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাসাবাড়ির ব্যবহৃত পানির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, “খাওয়ার পানি কিনে খেতে হয়। বাসার পানি ব্যবহার করলে শরীরে চুলকানি ও অ্যালার্জির সমস্যা হয়। গত দুই বছরে তিনবার বাসা বদল করেছি।”
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নুনিয়ারছড়ার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ। তিনি জানান, “টিউবওয়েল থেকে শুধু নোনা পানি আসে। মাটির যত গভীরে যাই না কেন, লবণাক্ত পানি বের হয়।”
শুধু আবাসিক এলাকাই নয়, পর্যটননির্ভর এই শহরের হোটেল-মোটেল জোনেও সংকট তীব্র আকার নিয়েছে। ফলে শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও পানি সরবরাহ কেন্দ্র। সংশ্লিষ্ট এক প্রতিষ্ঠানের দাবি, প্রতিদিন শুধু হোটেল এলাকাতেই কয়েক লাখ টাকার পরিশোধিত পানি সরবরাহ করতে হয়। পর্যটন মৌসুমে এই চাহিদা চার থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত গভীর নলকূপ স্থাপন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যটন শিল্পের বিস্তার এবং আশপাশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অতিরিক্ত পানির চাহিদা—সব মিলিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। দ্রুত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পুনঃভরণ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুবেল বড়ুয়া জানান, “১৪-১৫ বছর আগে স্থাপিত পাম্প হাউসগুলোতে ১৫০ থেকে ২০০ ফুট গভীরেই পানি পাওয়া যেত। কিন্তু এখন অনেক এলাকায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ ফুট গভীরেও মানসম্মত পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পাওয়া গেলেও তা অনেক ক্ষেত্রে লবণাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত।”
সংকট মোকাবিলায় বাকখালী নদীর তীরে নির্মিত ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে পৌর এলাকার মোট পানির চাহিদার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি পরিশোধনের সক্ষমতা থাকবে প্ল্যান্টটির।
এছাড়া সুগন্ধা পয়েন্টে নির্মিত ৭ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার একটি ওভারহেড রিজার্ভার থেকে প্রায় ৩০০টি হোটেলে পানি সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা পর্যটন এলাকায় কিছুটা স্বস্তি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডিপিএইচই কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ জানান, “বাকখালী নদীর পানি পরিশোধন করে পৌরবাসীর কাছে সরবরাহ করা হবে। আমরা আশা করছি, চলতি বছরেই এই প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করবে পৌরবাসী।”
নগরবাসীর প্রত্যাশা—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সুপেয় পানির এই সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক ও জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
Leave a Reply